গ্রাফিক্স ডিজাইনে ক্যারিয়ার ও চাকরির সুযোগ

গ্রাফিক্স ডিজাইনে ক্যারিয়ার ও চাকরির সুযোগ

আঁকাআঁকি করতে কার না ভালো লাগে? খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে যে ছোটবেলায় একবারও কিছু আঁকার চেষ্টা করেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আঁকার সময় আমরা যা চেষ্টা করি তা হচ্ছে হুবুহু কিছু একটা আঁকতে। তবে আমার মতো যারা একদমই হুবুহু আঁকতে পারেন না তারা হয়তো এ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেন।

তবে এমন অনেক চিত্রশিল্পী আছে যারা রং, তুলি, ক্যানভাস দিয়ে শুধুমাত্র চোখের দেখায় বাস্তব প্রাকৃতিক দৃশ্য হুবহু এঁকে ফেলতে পারেন। আবারো এমনও অনেকে আছেন যারা হুবুহু যে শুধু আঁকতেই পারেন তা নয়, তারা এঁকে ফেলেন অবাস্তব বা ব্যতিক্রমী কিছু দৃশ্য যা কেউ আগে কখনই দেখেনি।
কেমন হয় যদি এই রং, তুলি, ক্যানভাসকে ডিজিটাল রূপ দেয়া যায়? হ্যাঁ! আজ আমরা কথা বলবো গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে

গ্রাফিক্স ডিজাইন কী?

গ্রাফিক্স ডিজাইন হচ্ছে এমন এক ধরনের শিল্পকর্ম যেখানে একজন শিল্পী তার দক্ষতা, নৈপুণ্যতা ও সৃজনশীলতার সাহায্যে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, টাইপোগ্রাফি, দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ছবি – সহ অন্যান্য কৌশল অবলম্বন করে কম্পিউটার সফটওয়্যার ও টুলের মাধ্যমে চিত্রকর্মের সৃষ্টি করেন যা বিভিন্ন দৃশ্য ও অর্থ বহন করে।

একটি গ্রাফিক্স ডিজাইন হতে পারে তথ্যবহুল। ডিজাইনার তার সৃজনশীলতার বিশেষ গুণকে ব্যবহার করে ভিন্নধর্মী বার্তা প্রদান করতে পারেন। আরেকটু সাবলীল ভাষায় বলতে গেলে গ্রাফিক্স ডিজাইন এমন একটি আর্ট যা কম্পিউটারের মাধ্যমে সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিভিন্ন তথ্যবহুল নকশা অংকন করার সুযোগ করে দেয়। আর যারা গ্রাফিক্স ডিজাইন করেন বা গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজটি সম্পাদনা করেন তাদের গ্রাফিক ডিজাইনার বলে।

কেন গড়বেন গ্রাফিক্স ডিজাইনে ক্যারিয়ার?

সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র

ভিজুয়্যাল কমিউনিকেশনে দক্ষতা আপনার জন্য খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার দ্বার, এই কাজের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে আছে – গ্রাফিক ডিজাইনার, আর্ট ওয়ার্কার, ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনার, ইনফোরমেশন আর্কিটেক্ট, ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি ডেভেলপার, ইলাস্ট্রেটর, মোশন গ্রাফিক ডিজাইনার, ওয়েব ডিজাইনার ও ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টর ইত্যাদি।

সুতরাং বলা বাহুল্য গ্রাফিক্স ডিজাইন অনলাইন জগতের এক বিশাল সম্ভাবনার ভান্ডার এবং এতে অভিজ্ঞ ব্যক্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এমনকি ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে গড়ার অন্যতম মাধ্যম গ্রাফিক্স ডিজাইন (যদিও এই আর্টিকেলে আমরা ফ্রিল্যান্সিংয়ের চেয়ে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে চাকরির মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়ার দিকেই বেশি প্রধান্য দিয়েছি)।

সৃজনশীল ও চ্যালেঞ্জিং পেশা

আপনি যদি সৃজনশীল কোন কাজকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চান তাহলে গ্রাফিক ডিজাইন হতে পারে আপনার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ এই ক্যারিয়ার আপনি আপনার ভেতরের ধারণাগুলিকে সৃজনশীলতার সাহায্যে প্রাণবন্ত করে তা থেকে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, ‘out of the box’ চিন্তার মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করার সুযোগও থাকছে এই পেশায়।

রিমোট ওয়ার্কিংয়ের সুবিধা

গ্রাফিক্স ডিজাইনকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেয়ার আরেকটি বড় কারণ হতে পারে এর রিমোট ওয়ার্কিং (remote working) বা গতানুগতিক অফিসের পরিবেশের বাইরে গিয়ে নিজের মতো কাজ করার সুযোগ। ২০২০ সালে যখন করোনাভাইরাস জনিত লকডাউনে সমগ্র বিশ্বের জীবনযাত্রা থমকে গিয়েছিলো তখনও গ্রাফিক ডিজাইনারদের কাজে বা চাহিদায় খুব একটা ভাটা পরেনি। বরং এ সময়গুলোতে তারা সাধারণ কাজ বা প্রোজেক্টের বাইরে গিয়ে নিজের মতো কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।

সব ধরনের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার সুযোগ

তাছাড়া গ্রাফিক ডিজাইনারদের প্রতিষ্ঠানভেদে প্রায় সব ধরণের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার সুযোগ থাকে। আজকাল ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই কার্যকর ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনের জন্য গ্রাফিক ডিজাইনারের প্রয়োজন হয়। এই পেশায় তাই বিভিন্ন ধরণের ক্লায়েন্ট ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়।

গ্রাফিক্স ডিজাইনের প্রকারভেদ

গ্রাফিক্স ডিজাইনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
১. স্থির চিত্র বা স্টিল ইমেজ গ্রাফিক্স (Still Image Graphics)
২. চলন্ত ছবি বা মোশন গ্রাফিক্স (Motion Graphics)

গ্রাফিক্স ডিজাইনের প্রকারভেদ

স্থির চিত্র বা স্টিল ইমেজ গ্রাফিক্স

স্থির চিত্র বা স্টিল ইমেজ গ্রাফিক্সের ৩টি ধরন আছেঃ
১. রাস্টার ইমেজ (Ruster Image) – পিক্সেল বেসিস
২. ভেক্টর ইমেজ (Vector Image) – পিক্সেল ইন্ডিপেন্ডেন্ট
৩. টাইপোগ্রাফি (Typography)

চলন্ত ছবি বা মোশন গ্রাফিক্স

চলন্ত ছবি বা মোশন গ্রাফিক্সের আবার রয়েছে ২টি প্রকারঃ
১. এনিমেশান গ্রাফিক্স (Animation Graphics)
২. ভিডিও গ্রাফিক্স (Video Graphics)

গ্রাফিক ডিজাইনার হতে কী কী প্রয়োজন?

আপনি যদি একান্তই গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সংকল্প নেন, তাহলে সফটওয়্যার আর টুল সম্পর্কে জানার আগে যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে তা হলো আপনাকে এর পেছনে দিতে হবে যথেষ্ট সময়, শ্রম ও ধৈর্য। বিশেষ করে ধৈর্য ছাড়া গ্রাফিক্স ডিজাইনে সফলতা পাওয়া কঠিন বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। এরপর আপনি এই স্কিলগুলোর গড়ার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন –

  • কালার থিওরি ও কালার প্যালেট সম্পর্কে ধারণা
  • ফন্ট সম্পর্কে ধারণা
  • ইউআই/ইউএক্স নিয়ে ধারনা
  • সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারার ক্ষমতা
  • এটেনশন টু ডিটেইল বা বিশদভাবে মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা
  • সময়, খরচ ও ডেডলাইন সম্পর্কে পেশাগত ধারনা
  • ডিজাইনিং সফটওয়্যার এবং টুলে পারদর্শীতা

বেসিক কিছু ডিজাইনিং সফটওয়্যার আর টুলের মধ্যে আছে –

শুরুর দিকে এই টুলগুলো আয়ত্ব করতে পারলে পরবর্তীতে জ্ঞানের পরিধি আরো বিস্তৃত করার সুযোগ পাওয়া যায়।

গ্রাফিক ডিজাইনারদের কাজগুলো কেমন হয়?

গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করলে আপনাকে যেরকম কাজ করতে হতে পারে তার খানিকটা ধারণা নিচে দেয়া হলো। যদিও এর সবই আপনার করতে হবে ব্যাপারটা তা নয়, তবে ক্ষেত্রে বিশেষে এর অধিকাংশই আপনাকে কোন না কোন এক সময় করতে হতে পারে তাই এগুলো নিয়ে ধারণা থাকলে আপনি আত্মবিশ্বাসের সাথে যেকোন ক্ষেত্রে কাজ শুরু করতে পারবেন।

  • কোম্পানি বা ব্র্যান্ডের লোগো তৈরি
  • বই, অ্যালবাম, ম্যাগাজিনের কভার ডিজাইন
  • সাইনবোড, বিলবোর্ড, ব্যানার বিজ্ঞাপন (banner advertisement) তৈরি
  • প্রিন্ট অ্যাড (print advertisement) ডিজাইন
  • ডিজিটাল গ্রাফিক্স (digital graphics) ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন (digital advertisement) তৈরি
  • ওয়েব ডিজাইনিং (web designing) ও মোবাইল অ্যাপ ডিজাইন
  • অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরি
  • ফটো এডিটিং
  • ব্লগসাইটের জন্য কভার বা ইমেজ ডিজাইন
  • পণ্যের মোড়ক (packaging) ডিজাইন
  • টিভি নিউজ বা প্রোগ্রাম চলাকালীন গ্রাফিক্স ও টাইটেল ডিজাইন
  • কার্ড, ব্রোশিয়র (brochure), ইনফোগ্রাফিক্স (infographics) ডিজাইন
  • টি-শার্ট এবং জামা কাপড়ের জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইন
  • ভিজিটিং কার্ড ডিজাইন
  • মেমো, ভাউচার ডিজাইন
  • স্টেশনারি (নোটপ্যাড, নোটবুক) ডিজাইন

গ্রাফিক্স ডিজাইনিংয়ে চাকরির বাজার ও আয়ের সুযোগ

যেমনটা এর আগে বলছিলাম, বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই নিয়োগ পাচ্ছে গ্রাফিক্স ডিজাইনে পারদর্শী ব্যক্তি। দেশি-বিদেশী সংস্থার ইন-হাউস গ্রাফিক ডিজাইনার ছাড়াও কাজের সুযোগ আছে – অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সি, ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি, প্রিন্টিং হাউজ, ব্র্যান্ড এজেন্সি, বই ও ম্যাগাজিন-পত্রিকার পাবলিশিং হাউস, মাল্টিমিডিয়া কোম্পানি, টেলিভিশন ও ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি সহ নানান ক্ষেত্রে।

খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে ভলতে গেলে, নতুন একজন গ্রাফিক ডিজাইনার শুধুমাত্র ব্যানার ও ভিজিটিং কার্ড ডিজাইনের মাধ্যমে মাসে প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠান গুলো প্রাথমিক স্তরের গ্রাফিক ডিজাইনারদের জন্য বেতন হিসেবে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা নির্ধারণ করে থাকেন।

তবে ক্রমান্বয়ে চাকরির পদোন্নতির সাথে সাথে আয়ের সুযোগও বাড়তে থাকে। আর আপনি যদি ভিজুয়্যাল কমিউনিকেশনে চাকরির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন সেক্ষেত্রে লাখ খানেকের উপর আয় করার সুযোগ থাকে। তবে সেজন্য আগে ১০-১৫ বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হয়।

পরিশেষে

প্রতিদ্বন্দ্বীতার বাজারে কোনো যেকোন পেশায় টিকে থাকতে ও সফলতা অর্জন করতে চাইলে নিজেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। সৃজনশক্তির অধিকারী ব্যাক্তিরা এক্ষেত্রে স্বভাবতই একধাপ এগিয়ে থাকেন। তবে চেষ্টা, কৌশল, বুদ্ধির সাহায্যে দক্ষতা অর্জন করে যে কেউ এই পেশায় সফলতা পেতে পারে।

এসব বিষয় বিবেচনা করে আপনি যদি গ্রাফিক্স ডিজাইনে ক্যারিয়ার গড়ার কথা চিন্তা করে থাকেন, তাহলে আপনার জন্য রইল শুভকামনা।

Sakib Ahmed
0 0 vote
Article Rating
Rate This Article
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
most voted
newest oldest
Inline Feedbacks
View all comments
Shah Md. Sultan
Shah Md. Sultan
May 3, 2021 3:33 pm

কালার থিওরি ও কালার প্যালেট সম্পর্কে ধারণা নিয়ে একটা ব্লগ পোস্ট করলে ভালো হয়।