প্রতিদিনকার খাওয়া-দাওয়া আর অন্যান্য নিত্তনৈমিত্তিক কাজের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোও আজকাল হয়ে উঠেছে মানুষের নিত্তদিনকার সঙ্গী। দিনের অনেকটা সময় মানুষ পার করছে ফেইসবুক, হোয়াটঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাট, মেসেঞ্জার, ভাইবার ইত্যাদি নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে। এভাবে হেলায় কাটিয়ে দেয়া সময়গুলো আপনার জন্য কতটুকু ফলদায়ক, তুমুল প্রতিযোগিতার ভীড়ে দিনে দিনে কতটুকু এগোচ্ছেন নাকি পিছিয়ে পড়ছেন, সেদিকে চোখ বুলাবার সময় এসেছে। এই প্রতিযোগিতার মাঝে নিজের একটি ভিত গড়ে তুলবার লক্ষ্যে, সেই সাথে পরবর্তী কর্মজীবনের জন্য নিজেকে এক ধাপ এগিয়ে রাখতে সময় গুলো কাজে লাগানোর একটি অন্যতম সামাজিক যোগাযোগ সাইট হচ্ছে LinkedIn। আপনি একজন সাধারণ চাকুরিপ্রার্থী কিংবা একজন দক্ষ পেশাজীবী বা লীডার যাই হোন, এই কর্পোরেট যুগে সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের কাছে নিজেকে উপস্থাপনের লক্ষ্যে একটি প্রফেশনাল, সমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন LinkedIn Profile এর জুড়ি নেই।

২০০২ সালে চালু হওয়া এই প্রফেশনাল যোগাযোগ মাধ্যমটিতে বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৫৩০ মিলিয়ন । জেনে নেয়া যাক এই মিলিয়ন সদস্যের মাঝে আপনিও আপনার স্থান কিভাবে নিশ্চিত করে নিবেন।

www.linkedin.com -এ ঢুকে আপনার নাম, ইমেইল ও পাসওর্য়াড দিয়ে জয়েন করলেই আপনি পেয়ে যাবেন নিজস্ব একটি লিংকডইন প্রোফাইল। এবার প্রোফাইলটিকে প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করাটাই হবে আপনার মূল লক্ষ্য।  LinkedIn Profile পূরণে অবশ্যই ইংরেজী ভাষা এবং 1st Person (উত্তম পুরুষ) ব্যবহারকে প্রাধান্য দিন। প্রথমটায় সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরুন আপনার “Summary” বা সারাংশ। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সজাগ থাকুন আপনার অডিয়েন্স সম্পর্কে। অর্থাৎ নিজের সম্পর্কে প্রতিটি বিবৃতি লিখবার আগে অবশ্যই মাথায় রাখুন,  আপনার প্রোফাইলটি পড়বার পর তারা আপনার কাছ থেকে কি কি প্রত্যাশা করতে পারছেন কিংবা এই তীব্র প্রতিযোগিতার ভীড়ে কর্পোরেট দুনিয়ার মানুষদের কাছে নিজেকে কতটুকু প্রত্যাশিতরূপে উপস্থাপন করতে পারছেন।

যেমন- একজন নিয়োগকর্তা (employer), ম্যানেজার কিংবা সম্ভাব্য কাস্টোমার যখন আপনার  পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা কিংবা আপনার প্রোফাইলের কোনো অংশ দেখবেন, সেক্ষেত্রে তাদের কোম্পানীর জন্য আপনি কতটুকু যোগ্যতা বহন করেন- সেই বিষয়টি যেন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়। তাই সারাংশে “I managed a team of 10 people”– এভাবে লেখার পরিবর্তে, কথাটিকে – “I was able to attract and hire top talent to round out my team, which then exceeded sales goals by 15 percent.” – এভাবে তুলে ধরাটা অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং আকর্ষণীয় হবে বলা যায়।

অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মতো LinkedIn Profile খোলা তাই কোনো কঠিন কাজ নয়। কঠিন কাজ হল নিজের সম্পর্কে তথ্যগুলো সাজানোর ব্যাপারে যথাসম্ভব পেশাদারিত্ব ও নৈপুণ্যতা ফুটিয়ে তোলা । এজন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করে তথ্যগুলোকে নিয়মিত আপডেট করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

১। শুরুটা হোক  আত্মবিশ্বাসী প্রফেশনাল একটি ছবি দিয়ে

কথায় আছে- “প্রথমে দর্শনধারী,পরে গুণবিচারী”। এক্ষেত্রে একটি প্রফেশনাল ছবি হতে পারে সম্ভাব্য employer দের নজর কাড়ার প্রথম সুযোগ। তাই শুরুতেই একটি ছবি আপলোড করে প্রোফাইলে রাখুন। খেয়াল রাখুন যাতে ছবিতে নিজেকে কনফিডেন্ট এবং প্রত্যয়ী দেখায়। আর হ্যা, অবশ্যই – keep your smile! 🙂

২। "Headline" বা শিরোনামটি হতে হবে লক্ষ্যণীয় ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ

LinkedIn Profile এর হেডলাইনে সচরাচর নিজের বর্তমান জব টাইটেল লিখে দিতে দেখা যায় (যেমন- Marketing Officer at XXXXX Limited)। তবে এটি না করে এর পরিবর্তে আপনার বিশেষ বিশেষ স্কিলগুলো তালিকা আকারে হেডলাইনে লিখে দিতে পারলে ভাল হয়। এতে করে আপনার হেডলাইন পড়েই মানুষ আপনার ক্যাপাবিলিটি সম্পর্কে একটা ধারণা পাবে। তাছাড়া  Search Result এ নিজের প্রোফাইলটিকে সর্বাধিক এগিয়ে রাখতে চাইলে গুরুত্বপূর্ণ keywords (যেমন- Digital Marketer, Freelance Graphic Designer, etc) ব্যবহার করুন আপনার প্রোফাইলে। চেষ্টা করুন, হেডলাইন বা শিরোনামটি ৮-১০ শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে।

৩। জীবনের সবথেকে উল্লেখ্যযোগ্য ৫-৬টি সাফল্যের সমন্বয়ে তুলে ধরুন আপনার Summary বা সারাংশ

আপনার প্রোফাইলটি যেন অডিয়েন্সের কাছে পড়তে ও বুঝতে সহজবোধ্য হয় সেদিকে লক্ষ্য  রাখুন। প্রথমেই ঠিক করুন কাদের মনোযোগ আকর্ষণ করাটা  আপনার মূল উদ্দেশ্য কিংবা কোন কোন সেক্টরের মানুষদের কাছে আপনার প্রোফাইলটিকে আপনি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চান। সেই টার্গেটিকে সবসময় মাথায় রেখে ছিমছামভাবে সাজিয়ে তুলুন আপনার LinkedIn Profile। সেই সাথে মিডিয়া ফাইল যেমন ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টস ইত্যাদি যুক্ত করতে পারেন আপনার প্রোফাইলে। আপনি যদি একজন ভাল বক্তা বা উপস্থাপক হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে নিজের পরিচয় তুলে ধরে ছোট্ট একটি ভিডিও ক্লিপ বানিয়ে প্রোফাইলে যুক্ত করতে পারেন। এতে প্রোফাইলে একটি ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হবে।

৪। চেষ্টা করুন প্রোফাইলের প্রতিটি অংশ পূরণ করবার

LinkedIn এ আপনার আগ্রহের সকল বিষয়গুলোকে সুন্দরভাবে তুলে ধরার সুযোগ আছে। সুন্দরভাবে সবগুলো সেকশন সাজিয়ে লিখলে প্রোফাইলে আপনার পার্সোনালিটি ফুটে উঠবে।আপনার কিছু কিছু স্কিল, অভিজ্ঞতা বা আগ্রহের বিষয় আছে যেগুলো হয়ত Resume তে তুলে ধরার মত না, সেগুলো LinkedIn এ তুলে ধরার সুযোগ আছে। কোন কোন কাজে আপনি পারদর্শী, আপনার বিশেষ বিশেষ দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা কোনো সামাজিক সংগঠনের  সাথে  স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা- ইত্যাদি বিষয়গুলোকে আপনি LinkedIn এ স্বাচ্ছন্দ্যে যুক্ত করতে পারেন ।

লক্ষ্য রাখুন- আপনার স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা যদি বর্তমান কাজের ধারার সাথে মিলে যায়। তাহলে অবশ্যই তা প্রোফাইলের উপরের অংশে বা “Work History” অংশে যুক্ত করুন,যাতে এটি সহজেই অডিয়েন্সের নজরে আসে।

৫। Experience সেকশনে যুক্ত করতে পারেন Image কিংবা Documents

প্রোফাইলের এই সেকশনটিতে আপনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত যেকোনো ধরনের মিডিয়া ফাইল যুক্ত করার সুন্দর সুযোগ আছে। যেমন- আপনি চাইলে আপনার  অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত একটি তথ্যবহুল Visual Portfolio যুক্ত করতে পারেন এ অংশটিতে, এটি আপনার প্রোফাইলকে বাকিদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রাখবে।

৬। কেবল প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো গুরুত্ব দিন

লিংকডইন প্রোফাইলে আপনার একেবারে প্রতিটা কাজের পূর্ববিবরণী যোগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র সেই সকল Experience ও কাজের বিবরণ তুলে ধরুন যা আপনার বর্তমান career path বা objective এর সাথে প্রাসঙ্গিক।

৭। প্রাসঙ্গিক ওয়েবসাইট গুলোর লিংক যুক্ত করুন

আপনার কর্ম-সংক্রান্ত নিজস্ব কোনো ব্লগ বা অনলাইন পোর্টফলিও যদি থেকে থাকে, তাহলে অবশ্যই সেটির URL বা লিংকটি যুক্ত করুন প্রোফাইলে।

৮। চেষ্টা করুন কাজের "recommendations" বা সুপারিশ যুক্ত করতে

আগের কর্মস্থলের সহকর্মী, ম্যানেজার, পার্টনার কিংবা সহযোগীদের সাথে লিংকডইনের মাধ্যমে যোগাযোগ বা সংযুক্ত থাকার চেষ্টা করুন, পারলে তাদের কাছ থেকে রিকোমেন্ডেশন চেয়ে যুক্ত করুন আপনার প্রোফাইলে। এই সুপারিশগুলো আপনার LinkedIn Profile কে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।

৯। একটিভ থাকুন; নিয়মিত স্ট্যাটাস শেয়ার বা আপডেট করুন

আপনার Industry এর সাথে সংশ্লিষ্ট টপিক নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট বা এ বিষয়ে আপনার নিজস্ব চিন্তাভাবনা/মতামত নিয়মিত শেয়ার বা আপডেট করুন। এতে একজন সম্ভাব্য employer যখন আপনার প্রোফাইলে ঢুঁ মারবেন তিনি যেন আপনার কাজের ক্ষেত্রে আপনার চিন্তাভাবনা, প্যাশন, জ্ঞান, দক্ষতা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।

আশা করা যায়, উপরের কৌশল বা ধাপগুলো ফলো করে এগোলে, একটি সুন্দর লিংকডইন প্রোফাইলের মালিক হওয়া আপনার জন্য কঠিন কিছু হবে না। এদিক-ওদিক সময় অপচয় না করে আজই খুলে ফেলুন নিজের একটি LinkedIn Profile, পা রাখুন অনলাইনের কর্পোরেট দুনিয়ায়, আর চেষ্টা করুন নিজের নেটওয়ার্ককে আরো বড় করতে।

Sumaiya Shoilee

Sumaiya Shoilee

Student at University of Dhaka
Shoilee is currently studying Philosophy at University of Dhaka.
Sumaiya Shoilee
Rate This Article

Leave a Comment

avatar
  Subscribe  
Notify of
Do NOT follow this link or you will be banned from the site!