হার্শা ভোগলে, খুবই পরিচিত নাম আমাদের কাছে । আমরা হয়ত অনেকেই জানি না টিভি ধারাভাষ্যকতার বাইরেও আলাদা একটি পরিচয় আছে হার্শা ভোগলের। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং ভারতের বিখ্যাত আই আই এম এর অধ্যাপক । প্রখ্যাত এই ব্যাক্তির সারা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আই আই এমে দেয়া বক্তব্যর কিছু অংশ তোমাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি:

বেশীরভাগ সময়েই আমাদের সামনে কি আসতে চলেছে তার উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না ।

মনে কর তুমি একজন সাঁতারু । তুমি সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছো এবং তোমার অবস্থান হচ্ছে লেন ৩ এ । তোমার কোন নিয়ন্ত্রণ ই থাকবে না লেন ৪ এর সাঁতারু কি করছে কিংবা লেন ১ এর সাঁতারু কি করতে যাচ্ছে! তোমার একমাত্র নিয়ন্ত্রণ আছে তুমি কি করতে যাচ্ছ । যদি তুমি নিজেকে কেবল অন্য প্রতিযোগীরা কি করছে সেটা নিয়ে ব্যস্ত রাখো তবে তুমি কেবলই নিজেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছো যা তুমি করতে পারতে । আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি প্রতিপক্ষের ভাল খেলা দ্বারা কখনও জয় পরাজয় নির্ধারিত হয় না , নির্ধারিত হয় তোমার যতটুকু ভাল খেলা দরকার ছিল তুমি ততটুকু ভাল খেলছ কিনা সেটা দিয়ে । আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে এই থিওরির ব্যাপারে যে-

“ ফলাফল টাকে অপ্রয়োজনীয় কর, তোমার সবচেয়ে ভালটা দাও এবং নিয়ে নাও যা তুমি পাও”

ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ো না এবং এটাই অসাধারণত্বের একটি পথ । সবসময় আমি এমন কিছু করতাম যা করতে আমি ভালবাসতাম , একটি কাজ হিসেবেই আমি সেটাকে ভালবাসতাম । আমি নিজেকে বলতাম চল সামনে যাই , নিজের সেরাটা দিয়ে করি । তুমি বাস্তবিক অর্থে এর চাইতে বেশি কিছু করতে পার না । যা আমি পেতে পারতাম তার চাইতেও সবসময় আমি বেশি পেয়েছি এবং তখন প্রত্যেকবার আমি নিজেকে বলতাম-
“ এটাই মনে হচ্ছে সহজলভ্য টাকা। চল এটা করি “

যদিও এটা কখনও হয় নি । কোথাও একটা কিছু সবসময় বাদ পড়ত এবং একটা কিছু আমাকে সবসময় বলত –

“শোন, শেষ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ো না, শুধু তোমার কাজটি ততটা ভালভাবে করার চেষ্টা কর যতটা তুমি পার”

আমি আমার জীবনে অনেক মজাদার ব্যাপার শিখেছি এর মধ্যে একটি ছিল কিভাবে তুমি তোমার সম্পদগুলোকে আরও ভালভাবে কাজে লাগাতে পার । এটা অনেক আশ্চর্যজনক ব্যাপার তখনকার সময়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় ক্রিকেটারদের ছিল এমন একজন , যে ছিল শারীরিক ভাবে অক্ষম । সত্যি বলতে, তার কখনও ক্রিকেট খেলা উচিত ছিল না।সে তার জীবনে উইকেটের চাইতেও বেশি সংখ্যক রান নিয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করে । তার শট খেলার মত পর্যাপ্ত শক্তি ছিল না । সে ডান হাত দিয়ে বল করত আর বাম হাত দিয়ে থ্রো করত কারণ বাম হাত হচ্ছে শক্তিশালী হাত । আমরা সবাই বি এইচ চন্দ্র শেখর এর খেলা দেখে অভ্যস্ত । সে ছিল পোলিও রোগে আক্রান্ত । সে ছিল আমাদের তৎকালীন সময়ের নতুন বলের বোলারদের চাইতেও দ্রতগামী। আমরা তাকে অনুকরণ করতাম এবং আমি এটা বলতে পারি সে খুব সহজেই বলতে পারত কেন । শুধু ক্রিকেট খেলাই ছিল না সে বুঝতে পেয়েছিল তার এমন অনেক সেরা কায়দা আছে যা দিয়ে সে বল নিয়ে এমন অনেক কিছু করতে পারত যা স্বাভাবিক মানুষ ন্যূনতম ভয়ের কথা চিন্তা করে পারত না । তাই ভিভ রিচার্ডস যখন অবসর নেন তখন সে বলেছিল “বি এইচ চন্দ্র শেখর ই একমাত্র বোলার যাকে দেখে আমি ভয় পেতাম । সে আমাদের সবার জন্য একজন আদর্শ ।”

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা মেধার উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় । উদ্বিগ্ন হয়ো না আমি বুঝাতে চেয়েছি যখনই আমরা এমন কাউকে দেখি যে অনেক বেশি মেধাবী সাথে সাথেই বলি “ওয়াও!”আশা করি আমিও একদিন ওর মত হতে পারব ।
একসময় তুমি অবশ্যই খুঁজে পাবে শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র মেধাতেই নয় । একটা সময় পার করার পর তোমার মনে হবে মেধা আর সামর্থ্য হচ্ছে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় গুণ, যা তুমি অর্জন করেছ । তুমি কীভাবে মেধাকে কাজে লাগাচ্ছ সেটাই গুরুত্বপূর্ণ । এইজন্যই যে শব্দটা আমি ব্যবহার করতে ভালবাসি সেটা হল “মনোভাব”।
মনোভাবকে মেধার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি কারণ মেধা অহংকার তৈরি করে এবং মেধা সমস্যা সমাধান করে না । আমি এমন অনেক এক্সট্রিমলি মেধাবী ভারতীয় ক্রিকেটারকে দেখেছি যখন তারা এমন মুহূর্তের শিকার হয় যেখানে প্রায় সব রাস্তা বন্ধ তখন তারা জানেই না কি করতে হবে কারণ তাদের কখনোই সাফল্যের জন্য পরিশ্রম করতে হয় নি । তারা সবসময় তাদের মেধাকে ব্যবহার করে সাফল্য পেয়ে এসেছে ।
আমরা শচিনের দিকেই বা কেন তাকাই। তুমি বলো টেন্ডুলকার একজন ট্যালেন্ট । আচ্ছা ঠিক আছে । শচিন ১৪ বছর বয়সে টানা ৫৫ দিন বিরতিহীন ভাবে ক্রিকেট খেলেছে । সে ২ ঘন্টা ধরে প্র্যাকটিস করতো তারপর আবার একটি ম্যাচ খেলতে যেতো এবং তারপর আবার ও ২ ঘণ্টা প্রাকটিস করতো । সবশেষে ২ ঘণ্টা সে ডাইনিং টেবিলে ঘুমাত । একই জিনিস টানা ৫৫ দিন করা , এটা অবশ্যই মনোভাবের বিষয় ।

“সক্ষমতা আর মেধা প্রথম দরজা খুলে, হয়তবা সেটা দ্বিতীয় দরজাও খুলে কিন্তু তারা তোমার জন্য শেষ দরজা খুলবে না।”

আমাকে একবার এক অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক বলেছিল যখন তারা আর্মিতে এলিট কোর টিম গঠন করে তারা তখন প্রথমে তাদের ক্যারিয়ার রেকর্ড দেখে । যদি দেখে যে তুমি কখনোই ভুল করো নি তবে তারা তোমাকে কখনোই সেই টিমে নিবে না । তারা তোমাকে নিবে না কারণ যখন তুমি দেখবে তোমার পূর্বঅভিজ্ঞতা কিছুই আর কাজে দিচ্ছে না তখন তুমি বুঝতেই পারবে না কি করতে হবে সেই মুহূর্তে । তারা সেই সব লোককেই নেয় যারা ভুল করে এবং সেই ভুলের পর আবার নতুন ভাবে শুরু করে সেই ভুলকে অতিক্রম করে । তুমি যত ভুল করবে ততটাই জানবে যে কি কি তোমার করা যাবে না । শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তোমার যেমন যতটাই জানা লাগে কি করা লাগবে ঠিক ততটাই জানা লাগে কি করা লাগবে না ।
আমরা সবাই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই যেখানে ভুলকে প্রায় অপরাধের পর্যায়ে চিন্তা করা হয় কিন্তু আমরা সবাই কোন না কোন এক সময় ভুল করি । কিন্তু একই ভুল বারবার করা তা মেনে নেয়া যায় না । যদি তুমি একই ভুল বারবার করতে থাক তবে তুমি অন্যের শ্রদ্ধা হারাবে ।

একটা জিনিস তুমি এই একটা ঘন্টা থেকে নিয়ে নিতে চাইবে সেটা তুমি শীঘ্রই পেতে যাচ্ছো , সুন্দর । সেটা হতে পারে তোমাকে সময়ে সময়ে অস্থিতিশীল হতে দাও । এটা একটা পছন্দনীয় ব্যাপার । আমি তোমাদের সবাইকে বলছি সেই মূহুর্ত যখন তুমি মনে করবে তুমি স্থিতিশীল হওয়া শুরু করছো তখন আসলে তুমি আরও উল্টো পথে হাঁটছো কারণ জীবনে কেউই স্থিতিশীল হতে পারে না ।

আমার কাজ আমাকে প্রতি টেস্ট ম্যাচের আগে অ্যালান বোর্ডার এর সাথে ১৫ -২০ মিনিট বসার সুযোগ করে দিয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল আমি প্রত্যেক অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারদের বলি,

“রানের যত্ন নাও , ডলার তাদের যত্ন নিয়ে নিবে”

এটা প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের এবং ক্রিকেটারদের মনে রাখা উচি রান দিয়ে তৈরি হয় , টাকা দিয়ে নয় । আমি এটার অনেক উদাহরণ দেখেছি যে অনেক ভারতীয় উঠতি তারকা ক্রিকেটাররা রুপির পিছনে দৌড়াতে গিয়ে রানটা হারিয়ে ফেলে ।

“ তুমি নিজের কর্মক্ষমতার পথকে নিখুঁত কর এবং ফলাফলের চাপকে তোমার কর্মক্ষমতার পথে বাঁধা হতে দিও না । আমার কাছে এটাই শ্রেষ্ঠত্বের পথে একটি বিস্ময়কর যাত্রা ।”

আমি অনেক সেরা ক্রিকেটারদের থেকে জেনেছি তারা কখনও পরাজয় বুঝতে পারে না , তারা সেটাকে গ্রহণ করতে পারে না । যদি তাদেরকে কোন বাধার পথে ঠেলে দেয়া হত তারা ভাবত আমি কিভাবে সেটাকে পেরিয়ে যাব । এটাই তাদেরকে মহৎ করে তুলে । যখনই তাদের কে এমন কোন অবস্থায় ফেলে দেয়া হত যেখান থেকে দল প্রায় হারতে চলেছে তারা ভাবত “ হ্যাঁ এটাই এমন অবস্থা যেখানে আমি আসতে চাচ্ছি , কিভাবে আমি ম্যাচ জিতে আসতে পারি।” তারা কখনও এটা নিয়ে অভিযোগ জানাতে যেত না যে, এই পজিশনে যাওয়ার জন্য আমি কে ।

আমি মনে করি এটা আমাদের সকলের জীবনের জন্যই সত্য । তোমরা অনেকেই প্রায় প্রতিদিন ই এমন কোন অবস্থার সম্মুখীন হও যেখান থেকে তুমি কোন কিছু হারাতে চলেছ । অবস্থা নিয়ে পড়ে না থেকে নিজের সেরাটা দিয়ে বেরিয়ে আস সেখান থেকে ।

Niloy Deb Nath

Niloy Deb Nath

খেলা আর মুভি নিয়েই সারাদিন পড়ে থাকি।আর মাঝে মাঝে বই পড়ি।
এভাবেই যাচ্ছে- হয়তবা বাকি জীবন ও এভাবেই কাটবে।
তবে সুখে এই আছি এই যা!
Niloy Deb Nath
Rate This Article

Leave a Comment

avatar
  Subscribe  
Notify of
Do NOT follow this link or you will be banned from the site!