আমরা সবাই জানি যে প্রতি বছর রোজার শুরু বা দুই ঈদ ইংরেজি ক্যালেন্ডারের একই দিনে হয় না—১০ বা ১১ দিন পিছিয়ে যায়। আপনি কি জানেন, পহেলা বৈশাখ আর বাংলা ক্যালেন্ডারের জন্ম সেই কারণেই?

মোগল সাম্রাজ্যে বছর শুরু হতো হিজরি সন বা ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। কিন্তু দেখা গেল, সেটা একটা বিশাল ঝামেলা করছে রাষ্ট্র পরিচালনায়। মানুষের কাছ থেকে সরকার এখনকার মত তখনও খাজনা বা ট্যাক্স আদায় করতো। ফসল ওঠার ঠিক পর পর সেই খাজনা পাওয়া সহজ, কারণ কৃষকের হাতে টাকা থাকে। ছয় মাস পরে গেলে তার কাছে আর টাকা থাকে না। মাঠে কখন ধান আসে, সেটা নির্ভর করে ঋতুর ওপর, যা নির্ভর করে সূর্যের ওপর। এদিকে হিজরি সন চাঁদ-ভিত্তিক; এই বছর হিজরির যেই তারিখে ট্যাক্স দেয়ার দিন, পরের বছর সূর্যের হিসাবে সেটা ১০ দিন পিছিয়ে যাবে।

কেন পিছিয়ে যায়? চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট ২.৮ সেকেন্ড বা ২৯.৫৩০৫৯ দিন। ১২ মাসে মোট ১২ * ২৯.৫৩০৫৯ = ৩৫৪.৩৬৭ দিন। আর সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসতে লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন। তার মানে এক চান্দ্র বছর (হিজরি ক্যালেন্ডার) আর এক সৌর বছরের (ইংরেজি বা বাংলা ক্যালেন্ডার) মধ্যে প্রায় সাড়ে দশ দিন (১০.৬) তফাৎ হয়ে যায়। তাই ঈদ পেছাতে থাকে, খাজনা তোলার দিনও পেছাতে থাকে।

অর্থাৎ আজকে যদি ফসল তোলার দিন হয়, ৯ বছর পরে দেখা যাবে, হিজরি ক্যালেন্ডারে তারিখ একই আছে, কিন্তু ফসল ফলে পেকে গিয়েছে ৯০ দিন বা তিন মাস আগে। কৃষক সেই ফসল তুলে বিক্রি করে টাকা খরচ করে ফেলেছে, খাজনা তুলতে গিয়ে তখন তাকে শুলে চড়িয়েও লাভ হচ্ছে না, টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। (আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, কেন টাকা জমিয়ে রাখতো না? হাড়-জিরজিরে, দিন আনি দিন খাই কৃষকের হাতে জমিয়ে রাখার মত টাকা তখনও ছিল না, এখনও নেই)

এই সব ঝামেলার সমাধান করার জন্য আকবর ১৫৮৪ ইংরেজি সালে তার রাজসভার জ্যোতির্বিদ ফতেউল্লাহ সিরাজীকে নির্দেশ দিলেন, একটা নতুন সন-তারিখের পদ্ধতি তৈরি করতে।
ফতেউল্লাহ সিরাজী চমৎকার একটা সমাধান দিলেন। হিজরি সন, তৎকালীন ভারতীয় ক্যালেন্ডার (সৌর সিদ্ধান্ত নামের একটা সংস্কৃত জ্যোতির্বিদ্যার বই অনুসারে) আর আকবরের সিংহাসনে আরোহনের বছর, এই তিনটাকে মিলিয়ে তিনি একটি নতুন সন তৈরী করলেন। আকবরের প্রবর্তিত ধর্ম দ্বীন-এ-এলাহি-র সাথে মিলিয়ে এই ক্যালেন্ডারের নাম দেয়া হলো তারিখ-এ-এলাহি। (Historical Dictionary of the Bengalis, Kunal Chakrabarti and Shubhra Chakrabarti)। কিন্তু Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib এ লেখক Nitish K. Sengupta বলেছেন এই ক্যালেন্ডারের উৎপত্তি আকবরের অন্তত ৫০ বছর আগে, আলাউদ্দিন হুসেইন শাহ-এর আমলে, সিরাজী শুধু সেটাকে আরো প্রাঞ্জল করেছেন।

পদ্ধতিটা বেশ সহজ। নতুন সন গননা শুরু হলো হিজরি সনের সাথেই; অর্থাৎ প্রথম হিজরি সন = প্রথম তারিখ-এ- এলাহি সন; ২য় হিজরি সন = ২য় তারিখ-এ- এলাহি সন, ইত্যাদি করে ৯৬৩ হিজরি সন = ৯৬৩ তারিখ-এ- এলাহি সন। এই ৯৬৩ হিজরি বা তারিখ-এ- এলাহি হচ্ছে ১৫৫৬ ইংরেজি সন, আকবরের সিংহাসনে আরোহনের বছর, এবং হিজরি বছরের মতই এই ৯৬৩ তারিখ-এ-এলাহি চন্দ্র মাসের সাথে হিসাব করা হলো। কিন্তু ১৫৫৬ ইংরেজি সন, বা ৯৬৩ হিজরি বা ৯৬৩ তারিখ-এ-এলাহি থেকে তারিখ-এ-এলাহি আর চাঁদের সাথে নয়, সূর্যের সাথে গণনা করা শুরু হলো। অর্থাত যদিও ৯৬৪ হিজরি আগের মতই ৩৫৪ দিনে হলো, ৯৬৪ তারিখ-এ-এলাহি হলো ইংরেজি বছরের মতই ৩৬৫ দিনে।
ফসল ওঠার সাথে সাথেই তারিখ-এ-এলাহির নতুন বছরে মুগল সুবেদাররা খাজনা আদায় করলেন। কৃষকের উপরে আর চাবুক পড়লো না, এবং বাংলার কৃষকদের কাছে সেই জন্য তারিখ-এ-এলাহির বদলে এই নতুন বছর “ফসলি সন” হিসাবে পরিচিতি পায়, এবং এটা বাংলায় সরকারী ক্যালেন্ডার হয়ে যায় এভাবেই।

সিরাজী সুর্য সিদ্ধান্ত থেকে কিছু নক্ষত্রের ভারতীয় নাম নিয়ে সেগুলির ফারসী নাম ব্যবহার করেছিলেন তারিখ-এ-এলাহিতেঃ ফারোয়াদিন, আর্দি, ভিহিসু, খোরদাদ, তির, আমারদাদ, শাহরিয়ার, আবান, আযুর, দাই, বহম এবং ইস্ক্লদার মিজ। বাঙ্গালির জিভে সেগুলি পোষালো না, তাই অচিরেই নক্ষত্রগুলির সংস্কৃত বনাম অনুসারে বাংলা মাসের নামকরণ হয়ে গেলঃ

  • বিশাখা (Librae) থেকে বৈশাখ
  • জাইষ্ঠা (Scorpii) থেকে জৈষ্ঠ
  • আষাঢ়া (Sagittarii) থেকে আষাঢ়
  • শ্রাবণা (Aquilae) থেকে শ্রাবণ
  • ভাদ্রপাদা (Pegasi) থেকে ভাদ্র
  • আশ্বিনী (Arietis) থেকে আশ্বিন
  • কৃতিকা (Tauri) থেকে কার্তিক
  • পুস্যা (Aldebaran) থেকে পৌষ
  • আগ্রৈহনী (Cancri) থেকে অগ্রহায়ন
  • মাঘা (Regulus) থেকে মাঘ
  • ফাল্গুনী (Leonis) থেকে ফাল্গুন
  • চিত্রা (Virginis) থেকে চৈত্র।

[কোন কোন সূত্র অনুযায়ী আকবরের ক্যালেন্ডারের মাসের প্রতিটি দিনের আলাদা নাম ছিল, কিন্তু সেটা বিশাল ঝামেলা লাগাতো। তাই সম্রাট শাহজাহানের সময় ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মত সপ্তাহের প্রচলন করা হয় এবং মানুষের মাত্র ৭টা দিনের নাম মুখস্ত করা লাগে ]

তারপরেও একটা প্যাচ থেকেই গেল। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘুরে আসতে সময় আসলে লাগে ৩৬৫ দিনের একটু বেশি… ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড। সুতরাং ৩৬৫ দিনে বছর হিসাব করলে প্রতি চার বছরে ৪ * (৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড) = ২৩ ঘন্টা ১৫ মিনিটের মত বাদ পড়ে যায়। প্রতি ১০০ বছরে তাহলে প্রায় ২৪ দিন হারিয়ে যাবে। এটাকে ঠিক রাখার জন্য তাই প্রতি চার বছরে এক দিন যোগ করা হয়, তাই আমরা ইংরেজি ক্যালেন্ডারে লিপ ইয়ার পাই। (২৩ ঘন্টা ১৫ মিনিটের বদলে ২৪ ঘন্টা যোগ করা হচ্ছে প্রতি চার বছরে, তার মানে আমরা ৪৫ মিনিটের হিসাবে গোজামিল দিয়ে দিচ্ছি প্রতি চার বছরে একবার। অর্থাৎ ৩২ লিপ ইয়ার বা ১২৮ বছরে আবার এক দিন বাড়তি হয়ে যাবে। এখন পর্যন্ত এটা ইংরেজি ক্যালেন্ডারে কোন ঝামেলা করে নাই, আমরা শুধু হজম করে নিচ্ছি। কিন্তু ১২৮০ বছরে এটা ১০ দিনের ঝামেলা পাকাবে। সম্ভবত তার আগেই এটা ঠিক করার জন্য একটা বিশেষ দিন বিয়োগ করে নেয়া হবে)

বাংলা বছরে লিপ দিনের কোন হিসাব ছিল না, তাই আবার বাংলা তারিখ পিছিয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই বিচ্যুতি ঠিক করার জন্য বাংলা একাডেমি ১৯৬৬ সালে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে, যা বাংলা ক্যালেন্ডারের জন্য এই লিপ দিবসের বিচ্যুতি ঠিক করে। কমিটির প্রস্তাব ছিলঃ
– বছরের প্রথম পাঁচটি মাস, বৈশাখ থেকে ভাদ্র, হবে ৩১ দিনে (১৫৫ দিন)
– বছরের বাকি সাতটি মাস, আশ্বিন থেকে চৈত্র, গঠিত হবে ৩০ দিনে (২১০ দিন)
– মোট ৩৬৫ দিন
– বছর শুরু হবে ইংরেজি (গ্রেগরিয়ান) ক্যালেন্ডারের ১৪ এপ্র্রিল, এবং ইংরেজি ক্যালেন্ডারের প্রতি লিপ ইয়ার বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ হবে, ঠিক যেভাবে ফেব্রুয়ারিতে যোগ হয়। বাংলাদেশে ১৯৮৭ সাল থেকে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, তাই আমাদের পহেলা বৈশাখ ১৯৮৭ সাল থেকে ১৪ এপ্রিলেই পড়ে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা আর আসামে প্রচলিত বাংলা ক্যালেন্ডারে এখনো চাঁদ- সূর্যের অবস্থান দেখে বছরের শুরু নির্ধারণ করা হয়, তাই ওদের পহেলা বৈশাখ মাঝে মাঝে ১৪ এপ্রিল, মাঝে মাঝে ১৫ এপ্রিল পড়ে।

তাহলে এটা কত বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ? হিসাবটা মুখে মুখে না করতে পারলেও কাগজ কলমে করা কঠিন না। ১৫৫৬ ইংরেজি সন ছিল ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। ২০১৯ থেকে ১৫৫৬ বাদ দিলে হয় ৪৬৩। অর্থাৎ ৯৬৩ বঙ্গাব্দ থেকে আরো ৪৬৩ বছর পার হয়েছে, সুতরাং এটা ৯৬৩ + ৪৬৩ = ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। যদি সহজ ফর্মুলা চান, তাহলে (বর্তমান ইংরেজি বছর – ১৫৫৬) + ৯৬৩ = বাংলা সন।

এটা থেকে নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন, পহেলা বৈশাখ মোটেও আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য নয়, এখনও ৫০০ বছর হতেও বাকি আছে।

কিন্তু যদি ১ হিজরি = ১ তারিখ-এ-এলাহি বা বাংলা সন হয়ে থাকে, তাহলে এই বছর কেন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ কিন্তু ১৪৪০ হিজরি? উত্তরটা উপরে বলা আছে… ৯৬৩ বঙ্গাব্দ-র পর থেকে হিজরি চন্দ্র মাসেই চলতে থাকলো, কিন্তু বঙ্গাব্দ হয়ে গেল সৌর মাসে, অর্থাৎ প্রতি বছরে ইংরেজি ক্যালেন্ডের মতই বঙ্গাব্দ ১০.৬ দিন করে পিছিয়ে পড়তে থাকলো হিজরি থেকে। উপরে আমরা দেখলাম যে ৪৬৩ বছর পার হয়েছে। বছরে ১০.৬ দিন করে পেছালে ৪৬৩ বছরে ৪৯০৭.৮ দিন পিছিয়েছে বঙ্গাব্দ। তার সাথে যোগ হবে এই ৪৬৩ বছরের আরো ১১২ লিপ দিবস। এই মোট ৫০১৯ দিনের জন্যই প্রায় ১৪ বছরের তফাৎ হয়ে গিয়েছে হিজরি আর বঙ্গাব্দের।

তাই পহেলা বৈশাখে ইলিশ খেয়ে ইলিশের বংশ লোপ না করে বরং মোগলাই খাওয়া, যেমন কাবাব খেতে পারেন। ইচ্ছা হলে সেটা নাহয় পান্তা দিয়েই খান। বেচারা ইলিশরাও বড় হতে পারবে, আপনিও প্রায় সাড়ে চারশো বছরের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারবেন।

[ অ্যামেরিকার ট্যাক্সের দিন কিন্তু ১৫ এপ্রিল, দোসরা বৈশাখ। যদিও এর সাথে আকবরের ক্যালেন্ডার কোন সম্পর্ক নেই ]

ফীচার ইমেজঃ দৈনিক ইনকিলাব থেকে সংগৃহীত।

Javed Ikbal

Javed Ikbal is an engineer and BUET graduate, now lives in Boston, Massachusetts.
Javed Ikbal

Latest posts by Javed Ikbal (see all)

Rate This Article

Leave a Comment

avatar
  Subscribe  
Notify of
Do NOT follow this link or you will be banned from the site!