শিল্পকারখানা মানবসভ্যতার ক্রমবিবর্তনের বাস্তব নিদর্শন। দিন যত এগিয়েছে, শিল্পকারখানার আকার বিশাল থেকে বিশালতর হয়েছে। পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতায় তৈরি হচ্ছে নানান পন্যসামগ্রী, যা আমাদের জীবনকে করে তুলছে আরও আধুনিক আর উন্নত। কিন্তু এই শিল্পকারখানা থেকেই ঘটে গেছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা; যা কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবন আর তার গড়ে তোলা সম্পদ। ইতিহাসের এই কালো ঘটনা গুলোর বর্ণনা নিয়েই এই সিরিজ। তো, শুরু করা যাক!

Enschede Fireworks Disaster

রংবেরং এর আতশবাজির খেলা দেখতে কার না ভাল লাগে! কিন্তু এই আতশবাজিই হতে পারে ভয়াবহ দূর্ঘটনার কারণ। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ নেদারল্যান্ডের Enschede শহরে ঘটে যাওয়া এক আতশবাজির বিস্ফোরণ। ডাচ ভাষায় এই দূর্ঘটনাটি “Vuurwerkramp” নামে পরিচিত, যার অর্থ fireworks disaster.

SE Fireworks কোম্পানির কাজ ছিল আতশবাজি তৈরি করা। ১৩ মে, ২০০০ সাল। গ্রীনিচ সময় বেলা ১ টার দিকে SE fireworks কোম্পানির সেন্ট্রাল বিল্ডিংয়ের স্টোরেজে প্রথম আগুন লাগে, যেখানে প্রায় ৯০০ কেজি আতশবাজি রাখা ছিল। আতশবাজি থেকে বিস্ফোরণ হলে বাইরে রাখা আরও ২টি কন্টেইনারেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অবৈধভাবে আরও প্রায় ১৭৭ টন আতশবাজি রাখা ছিল। এখান থেকেই সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি ঘটে। প্রথম বিস্ফোরণের শক্তি ছিল প্রায় ৮০০ কেজি T.N.T. এর সমান আর দ্বিতীয়টার শক্তি ছিল প্রায় ৫০০০ কেজি T.N.T. এর সমতুল্য-যা পূর্বের চেয়ে প্রায় ৬.২৫ গুন বেশি! প্রায় ৩০ কিমি দূর থেকেও এই কম্পন অনুভূত হয়। এই শক্তিশালী বিস্ফোরণের কারণে সৃষ্ট আগুন এতই ভয়াবহ ছিল যে, পার্শ্ববর্তী দেশ জার্মানিও আগুন নিয়ন্ত্রনে অংশ নেয়।

বিস্ফোরণের কারণে ওয়্যারহাউসের চারদিকে প্রায় ১০০ একর বা ০.৪ বর্গ কিমি এলাকা ধবংস হয়। ৪০০ বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয় আর মোট ১৫০০ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ দুর্ঘটনায় ৪ জন অগ্নিনির্বাপক কর্মী সহ ২৩ জন নিহত হয়, আহত হয় প্রায় ১ হাজার মানুষ। Roomberk এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়। দূর্ঘটনার মোট ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪৫৪ মিলিয়ন ইউরো।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাস্টারসঃ Enschede Fireworks Disaster
অগ্নিকাণ্ড পরবর্তী চিত্র
স্টোরেজের আতশবাজিগুলো সুরক্ষিত বাংকারে রাখা ছিল বটে, কিন্তু বাহিরে অবৈধভাবে জমা করে রাখা কন্টেইনার গুলোর কারণে নিরাপত্তা অনেকটাই কমে যায়। এগুলো খুব কাছাকাছি ছিল এবং কোন ধরনের পার্টিশানিং ছিল না। অবাক করা ব্যাপার, দূর্ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে কোম্পানির অডিট করা হয়, যাতে ডাচ অফিসিয়ালরা একে নিরাপদ ঘোষণা করে। আসলে তখন শুধু বৈধভাবে রাখা আতশবাজিগুলোই সেখানে ছিল। ১৯৭৭ সালে যখন ওয়্যারহাউস বানানো হয়, তখন এটি ছিল শহরের বাইরে। কিন্তু এরপর আশেপাশে স্বল্পআয়ের মানুষেরা বসতি গড়ে তুললেও সিটি কর্পোরেশন এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয় নি। কোম্পানিকে অন্যত্র সরানোর নির্দেশনা দেয়া হয় নি শুধুমাত্র এই ভয়ে যে, সব খরচ তাদের দিতে হবে।

ঘটনাটির পরে কোম্পানির দুই ম্যানেজারকে আটক করা হয়। তাদের অবৈধভাবে আতশবাজি রাখা এবং দায়িত্বে অবহেলার অপরাধে বিভিন্ন মেয়াদে জেলে পাঠানো হয়। এদিকে ধারনা করা হয়, ইচ্ছাকৃত ভাবে কেউ এই আগুন লাগিয়েছিল। ২০০৩ সালে André de Vries নামে এক ব্যক্তিকে এই অভিযোগে আটক করে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে মোট প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন ইউরো দেয়া হয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে। এছাড়া ডাচ সরকার আতশবাজি তৈরির সাথে সম্পর্কিত নিরাপত্তামূলক আইনগুলো আরও কঠোর করে। ফলাফল হিসেবে এখন পর্যন্ত আরও তিনটি অবৈধ স্টোরেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এধরণের দূর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে।

Info Credit:
1. Wikipedia
2. https://www.aria.developpement-durable.gouv.fr
3. BBC
4. NL Times

Photo credit:
Wikipedia
https://i.redd.it/8xumlas89ovx.jpg

Galib Hassan Khan

Galib Hassan Khan

Co-Founder & CFO at Bohubrihi
An enthusiast who instead of doing what others do, likes to stand for a while and thinks "what's happening out there?"
Galib Hassan Khan
Rate This Article

Leave a Comment

avatar
  Subscribe  
Notify of
Do NOT follow this link or you will be banned from the site!