অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট : কোডেড নাকি নো-কোড?

অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট : কোডেড নাকি নো-কোড?

মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কিছু দূর ঘাঁটাঘাঁটি করলেই দেখতে পাবেন No-Code বা Low-Code অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের প্রলোভন। 

এমন অনেক প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পাবেন যেখানে কোনোরকম কোডিং ছাড়াই একটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করে ফেলা সম্ভব। একইভাবে, এমন অনেক ইন্টারনেট টুলস আছে যা দিয়ে আপনি কোনোরকম কোডিং ছাড়াই একটি মোবাইল অ্যাপ ডিজাইন করে নিতে পারবেন। এগুলোকে বলা হয় No-code/Low-code অ্যাপ।

২০২০ এর গ্লোবাল প্যানডেমিকের কারণে অনেক ছোট-বড় কোম্পানিই তাদের বিজনেস মডেলে এই No-Code/Low-Code অ্যাপের ব্যবহার নিয়ে এসেছে। 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে No-code দিনে দিনে Native কোডিং-এর স্থান দখল করে নিচ্ছে।

কিন্তু তা-ই যদি হবে তাহলে মনে হতে পারে কেন এখনও মোবাইল অ্যাপ বানানোর জন্য বড় বড় কোম্পানিগুলো ডেভেলপার নিয়োগ দিচ্ছে? কেন মানুষ একটি ছোট্ট মোবাইল অ্যাপ তৈরি করতে এত অর্থ সময় ব্যয় করছে ?

এর কারণ, Coded এবং Non-Coded দুই ধরনের অ্যাপ ডেভেলপমেন্টেরই নির্দিষ্ট ভালো দিক, খারাপ দিক রয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলটিতে আমরা জেনে নিবো Coded ও non-coded মোবাইল ডেভেলপমেন্টের পার্থক্য ও তাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো।

কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট

প্রচলিত ধারণা অনুসারে আমরা অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট বলতে কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্টকেই বুঝি। এক্ষেত্রে ডেভেলপাররা নিজেরাই কোড করে ফ্রন্ট এন্ড, ব্যাক এন্ড ডেভেলপের কাজ করে থাকেন।  

কোডিং এর মাধ্যমে অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জন্য বেশ কয়টি জনপ্রিয় Programming Language হল Java, Javascript, Kotlin, Dart, Swift, Python, PHP। ফ্রেমওয়ার্ক এর মধ্যে আছে  React-Native, Flutter, Xamarin। কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের “মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট পরিচিতি” আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।

কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট এর সুবিধা অসুবিধাসমূহ
কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট এর সুবিধা অসুবিধাসমূহ

কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের সুবিধাসমূহ

সিকিউরিটি

গতানুগতিক রীতিতে ডেভেলপ করা অ্যাপগুলো যেহেতু একজন ডেভেলপার নিজে কোড করবেন, তাই এর ভেতর-বাইরের সবকিছুই হবে তার জানা। এই অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়ায় ডেভেলপারকে Front-End, Back-End ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি নিজস্ব ডেটা সার্ভারও তৈরী করতে হবে।

এবং, আপনার অ্যাপের ব্যবহারকারীদের সকল ডেটা আপনার এই নিজস্ব ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। যেহেতু এখানে কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ থাকছে না, তাই কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট আপনাকে নিঃসন্দেহে No-Code এর তুলনায় বেশি সুরক্ষা দিতে পারবে।

কাস্টোমাইজেশন

Java বা JavaScript এর মতো Programming Language ও বহুল ব্যবহৃত কিছু JS লাইব্রেরী কাজে লাগিয়ে মন মতো অ্যাপ ডিজাইন ও Customize করে নিতে পারবেন। অ্যাপ সফলভাবে Launch করার পরেও চাইলে সুবিধামতো ফীচারগুলো Customise ও Update করতে পারবেন।

ডিজাইন

নেটিভ কোডিং দ্বারা তৈরি অ্যাপ ডিজাইনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই থাকে। আপনি আপনার মন মতো ডিজাইন ও Visual ফিচারগুলো প্রয়োগ করতে পারবেন, অ্যাপ Prototype এর সাহায্যে ডিজাইন আগে থেকে টেস্ট করে নিতে পারবেন। এমনকি আপনার অ্যাপটি মোবাইলে চলাকালীন দেখতে ও ব্যবহার করতে কেমন হবে তা সবই আপনার মন মত সাজিয়ে নিতে পারবেন।

স্কেলেবিলিটি

Coded অ্যাপ খুবই স্কেলেবল। শুরুতে কোড লিখে অ্যাপ ডেভেলপ করতে একটু কষ্ট হলেও পরবর্তীতে ইউজার অনেক বেড়ে গেলে এই কষ্ট সার্থক। কারণ কাস্টমাইজেশন এবং অপ্টিমাইজেশন – এ দুটো খুবই ভালভাবে সম্ভব হয় Coded অ্যাপ এর ক্ষেত্রে। আর এর ফলে স্কেলেবিলিটিও বেশি।  

কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের অসুবিধাসমূহ

সময়সাপেক্ষ

নেটিভ কোড দিয়ে অ্যাপ ডেভলপ করা অবশ্যই No-code এর তুলনায় জটিল ও সময়সাপেক্ষ। No-Code এ যেখানে শুধু ফিচারগুলো drag and drop interface দিয়ে সাজিয়ে ফেলা যায়, নেটিভ কোডিং-এ সেখানে আলাদা আলাদা করে front-end, back-end ও database কোডিং করতে হয়। কাজেই, কোডেড অ্যাপ ডেভেলপমেন্টে সময় বেশি লাগে।

খরুচে

নেটিভ কোডিং-এর জন্য আপনাকে আগে Java বা JavaScript এর মত Programming Language ও Framework গুলো শিখতে হবে। বা, এই কাজে দক্ষ একজন প্রোগ্রামার নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়াও আপনাকে প্রোফেশনাল টুলস-এ অর্থ বিনিয়োগ করতে হতে পারে। সব মিলিয়ে, নেটিভ অ্যাপের মোট ব্যয় বেশি।

নো-কোড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট

Low-code/no-code যেটাই বলা হোক আসলে Code ছাড়া কোনো অ্যাপ ডেভেলপমেন্টই সম্ভব না। আপাতদৃষ্টিতে কোড নেই মনে হলেও আসলে No-code অ্যাপেও কোডিং একটি বড় অংশ। 

পার্থক্য শুধু এটাই যে, এই কোডগুলো আপনার নিজের বা আপনার ডেভেলপারকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে হচ্ছে না। এগুলো কিছু প্রি-রিটেন কোড, যা আপনি আপনার সুবিধা মতো সাজিয়ে আপনার অ্যাপটি তৈরি করে নিচ্ছেন।

পুরো No-code/Low-code প্ল্যাটফর্মটিই Java-র মতো কোনো একটি Programming Language কে আশ্রয় করে চলে।

তবে, No-code অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জন্য ব্যবহারকারীর কোনো ধরনের Programming Language জানা আবশ্যক নয়। কিন্তু, Low-code অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট ও সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহারকারীকে Programming Language সম্পর্কে অন্তত বিগিনার লেভেলের ধারণা রাখতে হয়। 

যে টুলগুলো ব্যবহার করে এই No-code অ্যাপ তৈরি করা হয়, সেখানে আগে থেকেই টেমপ্লেট আকারে কিছু অ্যাপের কোডিং করা থাকে। যেমন – eCommerce, Educational, Magazine, ইত্যাদি। সেখান থেকে আপনি আপনার সুবিধামতো ফিচার সেট সমেত ডিজাইনটি বেছে নিয়ে নিজের সুবিধামতো টুকিটাকি পরিবর্তন করে নেবেন।

নো কোড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট এর সুবিধা - অসুবিধাসমূহ
নো কোড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট এর সুবিধা - অসুবিধাসমূহ

নো-কোড অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের সুবিধাসমূহ

সময় বাঁচায়

Low-Code অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের একটি বড় সুবিধা হলো এই পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক কম সময়ে সেরে ফেলা যায়। সরল-সোজা অ্যাপ হলে হয়তো এক দিনের মধ্যেও ওয়ার্কফ্লো সহ একটি পরিপূর্ণ অ্যাপ তৈরি করে ফেলা সম্ভব। 

সহজে এডিট করা যায়

যেহেতু low-code অ্যাপগুলো তৈরি করতে হলে আপনাকে কোনো প্রোগ্রামিং Language ব্যবহার করতে হচ্ছে না, তাই কোডিং- এর ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এছাড়াও, অ্যাপের কোনো ফিচার বা ওয়ার্কফ্লো এর কোনো স্টেপ পরিবর্তন করতে চাইলেও আপনাকে নতুন করে কোড লিখতে হবে না। কাজেই, অনেক দ্রুত ও সহজেই অ্যাপটি এডিট করে ফেলতে পারবেন।

সাশ্রয়ী

একজন ডেভেলপারকে দিয়ে একটি প্রোফেশনাল লেভেল অ্যাপ তৈরী করতে আপনার যে টুলস লাগবে এবং যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে তার তুলনায় অনেক কম খরচে  No-code অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শেষ করে ফেলা সম্ভব।

নো-কোড অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের অসুবিধাসমূহ

সীমিত কাস্টোমাইজেশন

No-Code অ্যাপগুলোতে অ্যাপের Customization এর সুযোগ খুবই সীমিত। অ্যাপটি যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজনেস মডেলের একটি মূল অংশ হয়, তাহলে আপনার বিজনেসের সমৃদ্ধির সাথে সাথে অ্যাপের কার্যকারিতাও পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু, No-code অ্যাপে সেটা করা সম্ভব না। No-Code অ্যাপগুলোর scalability একেবারেই নগণ্য।

No-Code ব্যবহার করে Uber, AirBNB এর মতো বড় পরিসরের অ্যাপ ডেভেলপ করা সম্ভব না।

API

আপনি নিজস্ব API তৈরি করতে পারবেন না। কার্যতই, আপনার অ্যাপটি অনেক বেশি সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

সীমাবদ্ধ ফীচার

No-code অ্যাপগুলোতে অনেক ধরনের ফিচারের সংমিশ্রণ দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু, খুব বেশি অ্যাডভান্সড ফিচার পাওয়া দুষ্কর। আবার আপনার অ্যাপটি তৈরি করার পর আপনি No-code প্ল্যাটফর্মটি বাদ দিয়ে নিজস্ব ডেভেলপারের সাহায্য নিয়ে কোনো ফিচার কোড করে নেবেন, সেই সুযোগটাও অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। 

অথবা, আপনার কাঙ্ক্ষিত ফীচারটি পাওয়া গেলেও দেখা যাবে সেটি এতটাই ব্যয়বহুল যে গোড়া থেকে অ্যাপটি কোড করে নিলেই আপনার সব মিলিয়ে তুলনামূলক কম খরচ হত।

নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম-কেন্দ্রিক

প্ল্যাটফর্মের মুল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ক্লায়েন্ট ধরে রাখা। এমন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করার পূর্ব শর্তই হলো এই অ্যাপগুলো একটি নির্দিষ্ট Cloud Based environment এ চলবে। কাজেই আপনি অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম বা কোডিং Language ব্যবহার করে ঐ অ্যাপটির কোনোরকম পরিবর্তন,পরিমার্যন করতে পারবেন না। অর্থাৎ, আপনার অ্যাপ ঐ একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট Framework-এ লক-ইন হয়ে যাবে।

বারবার খরচ করতে হয়

বেশিরভাগ আ্যপ ডেভেলমেন্ট প্ল্যাটফর্মই মাসিক অথবা বাৎসরিক হারে একটি চার্জ নির্ধারণ করে যেটা আপনাকে আজীবন দিয়ে যেতে হবে। এটা একটা পুনরাবৃত্তিমূলক খরচ যা আপনাকে বছরের পর বছর বহন করতে হবে। 

সেই তুলনায়, Native অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের শুরুতে বেশি টাকা লাগলেও পরবর্তীতে অ্যাপ Maintain করতে অনেক কম খরচ হয়।

স্কেলেবিলিটি কম

No Code অ্যাপ স্কেলেবল না। কাজ শুরু করার জন্য ভাল হলেও একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক ইউজারের পর এটা আর স্কেল করা এবং পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে যায়।

0 0 vote
Article Rating
Rate This Article
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments