আন্ডারগ্রাডের থিসিস টপিক হিসেবে গ্রাফিন সম্পর্কে টুকিটাকি পড়াশুনা করতে হয়েছে। এর বিস্তৃতি যে এত বিশাল বলে শেষ করা প্রায় অসম্ভব। এখনকার আধুনিক প্রযুক্তির অনেকটাই গ্রাফিনের অবদান। যদিও এখন সিলিকন পূর্বের গ্রাফিনের জায়গা ইতিমধ্যেই দখল করে নিয়েছে তারপরেও গ্রাফিনকে পথপ্রদর্শকের জায়গাটা দিতেই হবে। এর হাত ধরেই ন্যানোটেকনোলোজীর আবির্ভাব হয়েছে। গ্রাফিনের আবিস্কারের ঘটনাটাও অনেক মজার। ২০০৪ সালের কথা। আন্দ্রে গেম এবং কনস্টান্টিন নভোসেলোভ নামের ২ জন বিজ্ঞানী পেন্সিল নিয়ে কাজ করছিলেন। পেন্সিলের নিব যেটা থাকে সেটা গ্রাফাইটের হয় এটা আমরা সবাই জানি। তো উনারা যেটা করলেন তা হল স্কচটেপ দিয়ে ঐ নিবের থেকে আস্তে আস্তে এক এক পর্দা করে তুলতে লাগলেন। এক এক পর্দা বলতে অনেক পুরু লেয়ার তুলে ফেললেন তারা। পরে তারা চিন্তা করলেন এর থেকেও কম পুরুত্বের বানানো যায় কি না। সেই ধারণা থেকে অনেকবার চেষ্টার পরে খুবই কম পুরুত্বের একটি লেয়ার তারা মাইক্রোস্কোপে দেখতে পেলেন যার পুরুত্ব ন্যানো স্কেলে চলে যায়। তখন থেকেই প্রযুক্তির দুনিয়ায় একটা বিপ্লব চলে আসল। এরপর ৪/৫ বছর এটা নিয়ে আরও অনেক গবেষণা চলল। ২০১১ সালের দিকে ব্যাপক হারে গ্রাফিনের ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। এখন আসি গ্রাফিন আসলে কি জিনিস? এর কাজই বা কি? কেনই বা এটা এত ব্যবহার হচ্ছে?

গ্রাফিন হল কার্বনের একপ্রকার রূপ যেখানে কার্বন পরমাণুগুলা বেনজিন বলয়ের মত ষড়ভুজের অনেক বড় একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করে থাকে। উচ্চমাধ্যমিকে আমরা পড়ে এসছি যে ফুলারিন্স বা বাকিবল হল সিলিন্ড্রিক্যাল একটা কার্বনের নেটওয়ার্ক। এখন যদি আমরা এই সিলিন্ড্রিক্যাল আকারকে যেকোনো এক জায়গা থেকে দৈর্ঘ্য বরাবর কেটে দিই তখন সেটা টু ডাইমেনশনাল একটা লেয়ারে পরিণত হবে। এই লেয়ারকেই আমরা গ্রাফিন বলে থাকি। গ্রাফিন নিজে খুবই শক্ত পদার্থ। একে ভাঙ্গাও অনেক কঠিন। এর এমন কিছু গুনাবলি আছে যার জন্য
বিজ্ঞানীদের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে এই গ্রাফিন। এটি দুনিয়ার সবচাইতে
শক্তিশালী এবং কঠিন ধাতু। আরো আশ্চর্যজনক কথা হলো প্রায় এই ধাতুর ওজন এতই কম যে ওজন নেই বললেই চলে। আপনি যদি ১ স্কয়ার মিটারের একটি শিট নেন তবে এর ওজন আসবে ০.৭ গ্রামের মত। গ্রাফিন তাপ, বিদ্যুতসহ সকল পরিবহন যোগ্য এনার্জি এটি প্রায় কোন প্রকারের লস না করেই পরিবহন করতে পারে। তাছাড়া এটি সুপার স্ট্রং এবং সুপার ফ্লেক্সিবল ধাতু। আপনি যতই টানুন এটি কখনোই ছিড়ে যাবে না।
গ্রাফিনকে আমরা গ্রাফিন অক্সাইড রূপে ব্যবহার করতে পারি। আবার প্রয়োজনানুসারে গ্রাফিন অক্সাইডকে বিজারিত করে ব্যবহার করতে পারি। তবে গ্রাফিন অক্সাইড থেকে বিজারিত গ্রাফিন অক্সাইড ভালো প্রোপার্টি দেয়। গ্রাফিন নিজে যত না উপকারী তারচেয়ে আরও বেশি উপকারী হয়ে যায় যখন আমরা কোন বস্তুর সাথে একে মিশাই। যেমন ধরা যাক প্লাস্টিকের কথা। নরমাল অবস্থায় প্লাস্টিক কখনই বিদ্যুত পরিবহণ করবে না। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারের সময় ১% থেকে ৩% গ্রাফিনসহ প্রস্তুত করা গেলে সেটা বিদ্যুত পরিবহণ করতে সক্ষম হবে। এমনই ক্ষমতা গ্রাফিনের।  

গ্রাফিন তাপ সুপরিবাহী বলে সহজে তাপ ছেড়ে দিতে পারবে। ফলে কম্পিউটার ঠান্ডা থাকে। অত্যন্ত স্বচ্ছ হওয়ায় গ্রাফিন ভিডিওচিত্র প্রদর্শনের মূল উপাদান হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। সূক্ষতার কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় এর রেজ্যুলেশন হবে অনেক বেশি এবং ব্যবহার হবে অনেক সহজ। এছাড়া গ্রাফিন অক্সাইড একটি অ্যান্টিব্যাক্টোরিয়াল। ফলে খাবার সংরক্ষনে এটি ব্যববহৃত করা যায়।

গ্রাফিন প্রায় ৯০% অপটিক্যাল ট্র্যান্সপারেন্ট ধাতু। কিন্তু আমরা যদি এর ফিজিক্যাল ট্র্যান্সপারেন্সি নিয়ে কথা বলি তবে যেহেতু এটি বন্ধনের পাতলা চাদরে তৈরি তাই এটির গঠনে অনেক লোমকুপ বা ছিদ্র রয়েছে এবং এই কারণে এটি একটি খুব ভালো ওয়াটার ফিল্টার হিসেবে কাজ করতে পারে। আগেই বলেছি এটি একটি টু ডাইমেন্সনাল ধাতু। অর্থাৎ শুধু এর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ রয়েছে কিন্তু এর ঘনত্ব নেই। একটি ওয়াটার ফিল্টারে যদি গ্রাফিন থাকে তবে গ্রাফিনের লোমকুপ বা ছিদ্র দিয়ে শুধু বিশুদ্ধ পানিই বেড় করে আনা সম্ভব হবে এবং পানির সাথে দ্রবীভূত লবণ বা যেকোনো কিছু আটকে যাবে। যদি কথা বলি সমুদ্রের পানি ফিল্টারেশনের কথা বা কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশে পানি ফিল্টারেশনের কথা তবে সেখানে গ্রাফিন ওয়াটার ফিল্টার সর্বোচ্চ পানি পরিষ্কারের কাজ করবে। যতটা ভালো দুনিয়ার এখনো পর্যন্ত কোন ওয়াটার ফিল্টার করতে সক্ষম নয়।

এবার কথা বলি সুপার ক্যাপাসিটার নিয়ে। আগে যে সকল ডিভাইস ক্যাপাসিটর হিসেবে কাজ করত সেগুলার সাথে গ্রাফিন বা গ্রাফিন অক্সাইড মিশালে তাদের ক্যাপাসিটেন্স অনেক গুন বেড়ে যায়। রীতিমত তারা সুপার ক্যাপাসিটর হিসেবে কাজ করা শুরু করে। সুপার ক্যাপাসিটারের সাহায্যে মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে যতো প্রকারের ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইজ আছে যারা ব্যাটারি এবং চার্জের সাহায্যে চলে সে ডিভাইজ গুলো সম্পূর্ণ রূপে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আপনি হয়তো আপনার ফোনকে ১০০ সেকেন্ডের ভিতরেই ফুল চার্জ করতে পারবেন এবং সারাদিন সাধারনভাবে তা ব্যবহার করতে পারবেন। আবার সামনের দিনে যদি ইলেকট্রিক কারের যা টেসলা কার নামে পরিচিত তার জনপ্রিয়তা বাড়ে তবে হয়তো ১০ মিনিটে বা ৫ মিনিটে আপনার কার ফুল চার্জ করতে পারবেন। আজকাল রাস্তায় বহুত ইলেকট্রিক রিক্সা এবং অটো দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো এগুলো চার্জ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে হয়। কিন্তু সুপার ক্যাপাসিটারের সাহায্যে তা ২-৩ মিনিটেই ফুল চার্জ হয়ে যাবে এবং স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা প্রদান করবে। আমার থিসিসের টপিক ছিল নিকেল অক্সাইডের সাথে গ্রাফিন অক্সাইড মিশিয়ে তার ক্যাপাসিটেন্স বৃদ্ধি করা। নিকেল অক্সাইড নিজে ক্যাপাসিটর হিসেবে কাজ করে। গ্রাফিন অক্সাইডের উপস্থিতিতে তার ধারকত্ব আরও বেড়ে যায়। একই ভাবে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইডের সাথে মিশালেও ধারকত্ব বাড়ে। সুতরাং বোঝায় যাচ্ছে, গ্রাফিনের দুনিয়া কতটা ব্যাপক এবং উপকারী।

Sazzad Emon
0 0 vote
Article Rating
Rate This Article
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
most voted
newest oldest
Inline Feedbacks
View all comments
Muhtasim Al Muyeed
Muhtasim Al Muyeed
March 1, 2019 12:06 am

খুব সুন্দর লিখা ভাই ?