মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট পরিচিতি

মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট পরিচিতি

বর্তমান টেকনলোজির যুগে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপ করা প্রায় সবার জন্যেই অত্যন্ত সহজ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, অ্যাপ স্টোরের প্রায় ১.৯+ মিলিয়ন ও গুগল প্লে স্টোরের ২.৭+ মিলিয়ন অ্যাপের মধ্যে টিকে থাকতে হলে কোনোরকম একটা অ্যাপ বানালেই হবে না, আপনাকে আপনার অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের পেছনে সময় দিতে হবে, অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের প্রতিটি স্টেজে বিশেষ খেয়াল দিতে হবে।

আর এর জন্য আগে আপনাকে বুঝতে হবে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট কিভাবে কাজ করে। এই লেখাটিতে আমরা খুব সহজে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের বিভিন্ন ধাপ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।

Mobile App Development Flow Chart (1)
Mobile App Development Flow Chart

অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট আইডিয়া

যেকোনো বড় উদ্যোগের সূচনাই হয় একটি অভিনব আইডিয়া থেকে। মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জগতে পা বাড়ানোর জন্যে আগে আপনার দরকার কার্যকারী একটি আইডিয়া। 

আপনার ভাবতে হবে অ্যাপটির মাধ্যমে আপনি কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবেন কিনা কিংবা কোন দৈনন্দিন কোনো কাজ সহজ করতে পারবে কিনা।

কোনো একটি সময়োপোযোগী আইডিয়া নিয়েই মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করতে হবে। আপনার আইডিয়াটি শুধু অভিনব হলেই হবে না, হতে হবে টেকসইও। দুদিন পরে যার দরকার ফুরিয়ে যাবে, এমন অ্যাপ ডেভেলপ করা হবে সময়-সম্পদের অপচয়। তাই আপনাকে এমন একটি আইডিয়া নিয়ে এগোতে হবে যেটা ভবিষ্যতে আরও বড় করতে পারবেন, যার সম্ভাব্য scalability রয়েছে।

উদাহরণ দিয়ে বলা যায় Magoosh এর Vocabulary Flashcards অ্যাপটির কথা। প্রতিদিন সময় বের করে শব্দচর্চা করাটা অনেকের জন্যই দূরুহ। অনেক পরীক্ষার্থীই প্রতিদিন কাজের ফাঁকে সময় করে উঠতে পারেন না। শব্দগুলো তাদের মোবাইলের অ্যাপে গোছানো থাকায় চলতি পথে তারা দরকারি শব্দগুলোর চর্চা চালিয়ে যেতে পারেন। 

এতে একদিকে যেমন পরীক্ষার্থীর সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার হবে অন্যদিকে তার প্রস্তুতিও এগিয়ে যাবে অনেকটা। একটি অ্যাপ দিয়ে একাধিক সমস্যার সমাধান হলো এবং  অ্যাপটি স্থবিরও নয়। দু’ মাস পর এর কার্যকারিতা শুন্য হয়ে যাবে না। সময়ের সাথে অ্যাপটিতে নতুন শব্দ ইনপুট করে এর ভ্যালু বজায় রাখা সম্ভব। অর্থাৎ এটি একটি scalable অ্যাপ আইডিয়া।

অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট করার পরিকল্পনা

আইডিয়া পাওয়া গেল, এবার পরিকল্পনার পালা। অন্য যেকোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগের মতো এখানেও আপনাকে প্রচুর সময় দিতে হবে পরিকল্পনা পর্যায়ে। Idea assessment, market research, competitive analysis সবকিছুই এই পরিকল্পনা পর্যায়ের অংশ।

আপনার মূল আইডিয়াটিতে কোনোরকম সংশোধন, সংযোজনের প্রয়োজন থাকলে তা এখানেই সেরে ফেলা হবে। এরপর দেখতে হবে বাজারে চাহিদা কেমন। আপনার অ্যাপের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি দেখতে কেমন হবে তারও একটি পরিষ্কার ধারণা দাঁড় করাতে হবে। মোটামুটি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে আপনি আপনার অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের পরের স্টেজে এগিয়ে যেতে পারবেন।

মোবাইল অ্যাপ এর প্রোটোটাইপ বা নকশা

অ্যাপ বানানোর মূল নীলনকশাই হলো App prototype। এই স্টেজে আপনার অ্যাপের মোটামুটি একটি ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড়িয়ে যাবে। 

মোবাইল অ্যাপের Prototype হলো অ্যাপটির মধ্যে মোট কতগুলো স্ক্রীন থাকবে, স্ক্রীনগুলো পরষ্পর কিভাবে কাজ করবে এই যাবতীয় মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে তৈরি করা একটি ড্রাফট। এই ড্রাফটটি হতে পারে খুব সাধারণ কাগজ-কলমে করা স্কেচ, অথবা একটি High-fidelity mock up যেটা চলবে আপনার মোবাইলে। অ্যাপের Prototype কোনো ধরনের কোডের সম্পৃক্ততা থাকে না, এখানে মূলত অ্যাপের Visual দিকটা নিয়ে কাজ করা হয়। 

সচরাচর তিন ধরনের অ্যাপ Prototype দেখা যায় –

    • কাগজে স্কেচ
    • লো-ফিডেলিটি সাদাকালো ডিজিটাল Prototype
    • হাই-ফিডেলিটি ডিজিটাল Prototype
অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট পরিচিতি - Low-Fidelity App Prototype For Testing Functionality
Low-Fidelity App Prototype For Testing Functionality

তুলনামূলক কম বাজেটের অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জন্য কাগজে স্কেচ করা Prototype  সবচেয়ে বেশি কার্যকর। প্রতিটা স্কেচ হলো একেকটা আলাদা আলাদা স্ক্রিন এবং এই স্ক্রিনগুলো মিলেই তৈরি হয় অ্যাপের ফ্লো। এই Prototype করাও যায় যেমন সহজে, তেমনি এটি দিয়ে ডিজাইন সম্পর্কিত অনেক সিদ্ধান্তও নেয়া যায় দ্রুত।

লো-ফিডেলিটি সাদাকালো অ্যাপ Prototype গুলো অ্যাপটির ডিজাইনের তুলনায় কার্যকারিতার দিকে বেশি জোর দেয়। চূড়ান্তভাবে কোডিং করার আগে যেকোনো অ্যাপের ফিচার, অপারেশন ইত্যাদি যাচাই করে নেওয়ার জন্য এই Prototype টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

হাই-ফিডেলিটি রঙিন Prototype গুলো হলো অ্যাপের ডিজাইন কার্যকারিতা বোঝার একটি অন্যতম উপায়। এই অ্যাপ Prototype-এর মাধ্যমে অ্যাপটি আপনি মোবাইল ফোনে চালিয়ে দেখতে পারবেন ডিজাইন টিম আপনার অ্যাপের আইডিয়াটা Visuals এর দিক থেকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছে কিনা।

Prototype তৈরি করা হলো অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্টেজ। Prototype-এর মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার অ্যাপের ডিজাইন আপনার আইডিয়া সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করছে কিনা। তার Structure, Screen ও Wireframe ব্যবহার করে অ্যাপটি কিভাবে কাজ করবে তা একটি সম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় Prototype-এর মাধ্যমে।

অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট পরিচিতি - High-Fidelity App Prototype For Testing Functionality
High-Fidelity App Prototype for Design and Useability

কোডিং এর মাধ্যমে অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট

অ্যাপ এর ডিজাইন Prototype ফাইনাল হয়ে গেলে এবার আপনাকে মন দিতে হবে ডেভেলপমেন্ট এর দিকে। এখানে মূলত দুইটি অংশ – ফ্রন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট এবং ব্যাক এন্ড ডেভেলপমেন্ট।

যে কোন ওয়েব সাইট বা ওয়েব এপ্লিকেশনের Front-End হলো যেটা user দেখতে পাবেন। Back-end Development হল অ্যাপটি বিহাইন্ড দ্য সিনে কীভাবে কাজ করবে তারই নীল নকশা। আপনার ক্লায়েন্ট আপনার ওয়েবসাইটে কোন বাটনে ক্লিক করলে কোন রেজাল্ট দেখতে পাবে তা আপনি নিয়ন্ত্রণ করবেন ব্যাক এন্ড ডিজাইনিং এর সাহায্যে।

মোবাইল অ্যাপ এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল UI(User Interface)। আপনার বানানো অ্যাপটি দেখতে সুন্দর হতে হবে এবং সেই সাথে এটি ভালো ইউজার এক্সপেরিয়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। ফ্রন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্টে ব্যবহৃত টুলস গুলো হল HTML5, CSS3, JavaScript, Bootstrap ইত্যাদি। 

মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জন্য বেশ কয়টি জনপ্রিয় Programming Language হল Java, Javascript, Kotlin, Dart, Swift, Python, PHP। ফ্রেমওয়ার্ক এর মধ্যে আছে  React-Native, Flutter, Xamarin। 

অ্যাপ টেস্ট

একটি ভালো অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জন্য অ্যাপ টেস্টিং অনেক লম্বা এবং অনেক ক্ষেত্রেই চলমান একটি প্রক্রিয়া। 

Statista-র একটি জরিপ মতে ২০১৯ সালে গুগল প্লে-স্টোর এবং অ্যাপেলের অ্যাপ স্টোর এর পেইড এবং ফ্রী অ্যাপ মিলিয়ে  বিশ্বব্যাপী মোট অ্যাপ ডাউনলোডের সংখ্যা ২০৪ বিলিয়ন। যার মধ্যে ঐ অ্যাপের রিটেনশন রেট অর্থাৎ অ্যাপটি ডাউনলোড করার পর বেশ কয়েকবার ব্যবহার করেছেন এমন ইউজার আছেন মাত্র ৩২%। অর্থাৎ আপনার অ্যাপটি শুধু বানানো পর্যন্তই আপনার কাজ শেষ না, অ্যাপটি এমন হতে হবে যাতে ইউজার তা ব্যবহার করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর তার জন্য প্রয়োজন অনেক নিখুঁত টেস্টিং।

টেস্টিং স্টেজের আপনাকে দেখতে হবে আপনার অ্যাপটি একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সঠিক ভাবে ডাউনলোড করা যাচ্ছে কিনা, অ্যাপটি বিভিন্ন ডিভাইসে ও বিভিন্ন অপারেটিং সিস্টেমে ঠিকমতো চলছে কিনা, বিভিন্ন নেটয়ার্ক অপারেটর ও হার্ডওয়্যারের সাথে অ্যাপটি কাজ করতে পারছে কিনা ইত্যাদি। 

এছাড়াও অ্যাপ Install, update, uninstall করা যায় যাতে সহজে, অ্যাপ চলাকালীন যাতে মোবাইলের কল ধরা, এসএমএস পড়া বা পাঠানো, এবং অ্যাপটির যাবতীয় Functionality ও Performance যাচাই করার অ্যাপ টেস্টিং-এর গুরুতপূর্ণ অংশ।

সার্ভার এবং অ্যাপ হোস্ট

অ্যাপ বানানোর পর এটি ইউজারে কাছে পৌঁছানোর আগে আরেক ধাপ বাকি থাকে। এই পর্যায়ে আপনার অ্যাপ এর জন্য দরকার হয় একটি সার্ভার। সার্ভার আপনার অ্যাপ ঠিকঠাকভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স দেয় এবং অ্যাপের হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

অ্যাপ ডেপ্লয়

আপনার অ্যাপটি সাবমিশনের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেই একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে ফর্মাল Launch করে ফেলতে হবে। প্রায় প্রতিটা অ্যাপ স্টোরের Launch পলিসিই ভিন্ন, তাই আগে থেকে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া ভালো।

নিয়মিত আপডেট

অ্যাপ Deploy করার পর ইউজারদের থেকে যে নানারকম ফিড-ব্যাক ও রিভিউ আসবে। তার উপর ভিত্তি করে অ্যাপে পরিবর্তন আনতে হবে এবং আপডেটেড ভার্সনের মাধ্যমে ইউজারদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

সঠিকভাবে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের প্রসেসটি বুঝলে অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের পুরো যাত্রা আপনার জন্য বেশ সহজ হয়ে যাবে। মোবাইল অ্যাপ বানানোর কাজটি শুধু প্রোগ্র্যামিং বা অ্যাপ Deploy করাতেই থেমে যায় না, এটি একটি বেশ দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তাই, প্রথম থেকেই প্রসেসটি ভালো করে বুঝে সামনে এগিয়ে গেলে প্ল্যানিং, বাজেট, টেস্টিং সব দিক থেকেই পুরো প্রজেক্টটি ম্যানেজ করাই আপনার জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক হয়ে যাবে।

মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট পরিচিতি
0 0 vote
Article Rating
Rate This Article
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments